অন্ধকার রাতের আলোকিত শাসক
রাত গভীর। মদিনার আকাশে নিস্তব্ধতা, অথচ এক মানবপ্রাণ নির্ঘুম। তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি, কিন্তু তাঁর চরণ পড়ে সাধারণ মানুষের গলিতে। আলোর জন্য নয়, বাহবার জন্য নয়।
তাঁর এই নীরব টহল কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায়, মানুষের নিরাপত্তার দায়ে।
এই মানুষটি হলেন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা, যিনি মানবতার জন্য রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রথম রেখা টেনেছিলেন, ইতিহাসে যার নাম “نظام العسس” বা নৈশ প্রহরী ব্যবস্থা।
‘আসসাস’ নতুন এক দায়িত্বের সূচনা
‘আসসাস’ আরবি একটি শব্দ, যার ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে পুরো একটি পদ্ধতির আবিষ্কার।
এই শব্দের অর্থ রাত্রিকালীন পাহারাদার। আজকের দিনের ‘পুলিশ ফোর্স’-এর ধারণা তখন ছিল না, কিন্তু ইসলাম তার রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতর থেকেই এই চিন্তাকে জন্ম দিয়েছিল। আর সেই জন্মদাতা ছিলেন হযরত উমর (রা.)।
তাঁর রাজত্বে রাত মানেই নিদ্রার সময় ছিল না, বরং ছিল জনগণের কষ্ট খুঁজে বের করার তপস্যা।
কারণ, তাঁর বুকে কেঁদে উঠত এক প্রশ্ন ‘আমি যদি না জানি প্রজার ক্ষুধা, তবে কেমন খলিফা আমি?’
এক রাতের শিহরণ জাগানো গল্প
এক রাত। উমর (রা.) শহরের এক প্রান্তে আগুনের আলো দেখতে পেলেন। এগিয়ে গেলেন। দেখলেন এক বিধবা মা, আগুনে হাঁড়ি চাপিয়ে সন্তানদের বোঝাচ্ছেন ‘তোমাদের জন্য খাবার হচ্ছে’। কিন্তু হাঁড়ির ভেতর ছিল কেবল পানি আর পাথর।
শিশুরা ক্ষুধায় কাঁদছে, আর মা আল্লাহর কাছে বলছেন—
‘হে আল্লাহ, উমরের বিচার করো। সে তো পেট ভরে খায়, আমরা অনাহারে।’
উমর থমকে গেলেন। নিজের নাম শুনে কেঁপে উঠলেন। কিছু না বলে ফিরে এলেন। খাদ্য, চর্বি ও প্রয়োজনীয় দ্রব্য নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। সঙ্গে থাকা সঙ্গী বললেন “আমিই বহন করি?”
উমরের চোখ জলে ভিজে ওঠে, জবাব দেন-
‘যদি তুমি আজ আমার বোঝা বহন করো, তবে কিয়ামতের দিন আমার পাপ কে বহন করবে?’
সেই রাতে ঐ নারীর ঘরে আগুন জ্বালিয়ে নিজের হাতে খাবার রান্না করলেন, শিশুর মুখে হাসি ফুটালেন। রান্নার ধোঁয়া আর ছাই লেগে গেল তাঁর দাড়িতে। কিন্তু তবু তৃপ্ত। কারণ, ক্ষুধার্ত একটি ঘর আজ শান্ত।
রাষ্ট্রযন্ত্র নয়, মানবতা-প্রণোদিত নিরাপত্তা
এমনই ইসলামের নিরাপত্তাব্যবস্থা। যেখানে নিরাপত্তা কেবল অপরাধ দমন নয়, বরং মানুষের সম্মান, আহার ও ঘুমের নিশ্চয়তা। হযরত উমর (রা.) জানতেন, রাষ্ট্রের অর্থনীতি, ন্যায়বিচার ও আধ্যাত্মিকতা একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। তাই তিনি চাইলেন—রাত হোক আলোয় ভরা, নয় ভয়ে ভরা।
আজকের দিনে যেখানে রাষ্ট্রপ্রধানদের রক্ষায় শত শত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন হয়, সেখানে উমর (রা.) ছিলেন আরো অনেকের প্রৃকৃত রক্ষক। নিজের ঘর নয়, অন্যের ঘরের শান্তিই ছিল তাঁর চিন্তা।
ইতিহাস হয়তো অনেক শাসকের নাম মনে রাখবে না, কিন্তু হযরত উমর (রা.)-এর মতো একজন খলিফা, যিনি নিজেই রাষ্ট্রের রাত্রিকালীন নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, যিনি নিজের ঘুম হারাম করেছিলেন প্রজার কান্নায়। তিনি থাকবেন মানবতার ইতিহাসে শ্রদ্ধার চূড়ায়।
তিনি প্রবর্তন করেছিলেন এক এমন নিরাপত্তা পদ্ধতি, যা আজও আমাদের শেখায়—শাসক যদি দায়িত্ববান হয়, তবে রাতও হতে পারে নিরাপদ।
kalerkantho